গভীর জ্বালানি সংকটের দিকে এগোচ্ছে দেশ

স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগ না দিয়ে আমদানিনির্ভর পথেই হেঁটেছে সরকার

দেশের জ্বালানি খাতে বর্তমানে যে তীব্র সংকট বিদ্যমান তা নীতিগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন। বিগত সরকার আমলে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে মনোযোগ না দিয়ে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছে।

দেশের জ্বালানি খাতে বর্তমানে যে তীব্র সংকট বিদ্যমান তা নীতিগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন। বিগত সরকার আমলে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে মনোযোগ না দিয়ে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছে। ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির কারণে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ডলার সংকটের কারণে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি আমদানিও নিশ্চিত করা যায়নি। কেবল তাই নয়, বিগত সরকারের অংশীজনদের কাছে জ্বালানি খাত ছিল অনিয়ম-দুর্নীতির বড় মাধ্যম। অন্যদিকে নানা সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মুখে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটেছে। সব মিলিয়ে দেশে জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র হয়ে উঠেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় বড় প্রতিশ্রুতি ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার ঘিরে। সরকার এর অংশ হিসেবে জ্বালানি খাতের জন্য স্বল্পমেয়াদে হলেও কার্যকর নীতি কৌশল নেবে, যা স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে— সেই প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে সেই নীতি পরবর্তী সরকারের সময়ও অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারও বিগত সরকারের ধারা বজায় রেখেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট থেকে ১১৫ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ পরিমাণ কার্গো আমদানিতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা, যেখানে এর আগের অর্থবছরে ৪০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকার এলএনজি কেনা হয়েছে। এর আগের তথা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার এলএনজি কেনা হয়েছিল। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানি ব্যয় আরো বেড়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকট কাটেনি। বরং আরো তীব্র হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ সংকটও বেড়েছে। আবার জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর নানামুখী তৎপরতার কারণে এলএনজি আমদানিও ব্যাহত হতে পারে, যা গ্যাস সংকট আরো বাড়িয়ে তুলবে। যদিও স্বল্পমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে বর্তমান অনিশ্চয়তার অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশে স্থানীয়ভাবে গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধিতে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে পারত। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দায়িত্ব নেয়ার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান হয়নি। আবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধিতে যে অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন ছিল, সেদিকেও মনোযোগ দেয়নি এ সরকার। অথচ দেশে এলএনজি সরবরাহে দুটি টার্মিনাল রয়েছে। দুটির সক্ষমতা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট। আবার ২০২২ সালের শেষে তৎকালীন সরকার ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালে এসব কূপ খনন করে জাতীয় গ্রিডে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কূপের কাজ এখনো শেষ করা যায়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় কূপ খনন করে যতটুকু গ্যাস মিলেছে তার অর্ধেকের বেশি গ্রিডে ‍যুক্ত করা যায়নি। এর কারণ হলো পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার গ্যাস কূপ খনন ও পাইপলাইন প্রকল্প সমন্বয় করে সেটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিলে গ্রিডে সরবরাহ কিছুটা হলেও বাড়ানোর যেত। কিন্তু এজন্যও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে আরো ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের ঘাটতি রয়ে গেছে। কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় রিগ বা খননযন্ত্রের ঘাটতিসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতায়ও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

এলএনজি আমদানিতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা আংশিকভাবেও যদি পরিকল্পিত অনুসন্ধান ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা হতো, তবে বর্তমানে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এতটাও নাজুক হয়ে উঠত না। দীর্ঘদিন ধরেই নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২৫৮ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন উভয়ই কমছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির উৎপাদন কমেছে। এমনকি দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় অর্ধেক জোগানদাতা শেভরনের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সরকারের ভাষ্যমতে, ক্রমবর্ধমান গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতে দেশের জ্বালানি খাত আরো অশ্চিয়তার মধ্যেই পড়েছে। গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন কমার প্রেক্ষাপটেই বরং প্রয়োজন ছিল অনুসন্ধান ও স্থানীয় উৎপাদনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া।

স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া ও আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এরই মধ্যে গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে তা ভবিষ্যতে শিল্প খাতের জন্য আরো বড় হয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। আর এর সামগ্রিক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে শিল্প সম্প্রসারণ না ঘটলে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি ঘটবে না, যা বেকারের সংখ্যা বাড়াবে।

জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট দ্রুত সমাধানের সুযোগ নেই। তবে সুচিন্তিত নীতির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে সরকারের শেষ মেয়াদে সেটি আর সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না। আগামীতে নির্বাচিত সরকারের উচিত জ্বালানি সংকটে অগ্রাধিকারে রাখা। নয়তো সেটি সরকারের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। জ্বালানি খাতকে অবশ্যই আমদানিনির্ভরতা থেকে বের করে আনার ওপর জোর দিতে হবে। এজন্য দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এর অংশ হিসেবে সরকারকে স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

আরও